শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪

দলিল যার জমি তার : নতুন ভূমি আইনে যা আছে

নতুন ভূমি আইনে দলিল যার জমি তার এই নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জমি বা ভূমি নিয়ে মানুষের বিরোধ দীর্ঘ সময়ের। বাংলাদেশে অধিকাংশ দেওয়ানী ও ফৌজদারী মামলার উৎপত্তি ভূমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে। ইতোমধ্যেই হয়তো আপনারা জেনে গেছেন ২০২৩ সালে সরকার ভূমি সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে এক যুগপোযোগী আইন প্রণয়ন করেছে।

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন প্রণয়ণের মাধ্যমে এখন ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ যেমন দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে তেমনি জমির মালিকানা কিংবা দখল নিয়ে মারামারি ও হানাহানিও দিন দিন কমে আসছে। আজকের আলোচনায় থাকবে নতুন প্রণীত ভূমি আইনে কি কি বিষয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন আইনে আলোচনা করা হয়েছে তা নিয়ে।

নতুন ভূমি আইনে যা কিছু আছে

জমি বা ভূমির দলিলপত্র এবং মালিকানা নিয়ে প্রতারণা অর্থাৎ কোন জমির মালিক না হয়েও জমির মালিকানা হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এই আইনের ৪ ধারায় বিষদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

ভূমি বা জমির কাগজপত্র নিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে জালিয়াতি করলে তা অপরাধ হবে তা আলোচনা করা হয়েছে ৫ ধারায়।

অবৈধ দখল প্রতিরোধের জন্য এই আইনের ৭ ধারায় বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া কিভাবে এবং কোন উপায়ে অবৈধ দখল প্রতিরোধ করা যাবে তা ৭ ও ৮ ধারায় আলোচনা করা হয়েছে।

কোন জমি বিক্রি করার পরেও দখল হস্তান্তর না করলে তাও এই আইনে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উপরিউক্ত বিষয় ছাড়াও জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে এই আইনে আলোচনা করা হয়েছে।

মালিক না হয়ে জমি দখলে রাখা যাবে না

ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৭ ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি কোন জমির খতিয়ানসূত্রে মালিক না হন অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত না হন কিংবা আইনানুগভাবে বৈধ কোন জমির কাগজপত্র না থাকে তাহলে তিনি কোন জমি দখলে রাখতে পারবেন না।

এবং ৪(১)(ক) ধারায় বলা হচ্ছে, অন্যের মালিকানাধীন ভূমি স্বীয় মালিকানাধীন ভূমি হিসাবে প্রচার করলে তা হবে অপরাধ এবং এই ধারানুযায়ী ৭(সাত) বছর পর্যন্ত কারদন্ডের বিধান আছে।

তাছাড়া কোন ব্যক্তিকে তার আইনানুগভাবে বৈধ জমির দখল থেকে বেদখল করা বা বেদখল করার চেষ্টা করা যাবেনা। যদি কেউ জমির বৈধভাবে মালিক না হয়েও কোন ভূমি দখলে রাখে কিংবা কোন বৈধ মালিককে তার জমি থেকে উচ্ছেদ কিংবা উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় তাহলো সে এই ধারায় অভিযুক্ত হবে।

উপরে আলোচ্য কোন অপরাধ যদি কেউ করে সেক্ষেত্রে তার ২(দুই) বছরের কারাদন্ড হতে পারে।

আপনার ভূমি বা জমি যদি কেউ দখল করে রাখে বা দখলে থাকা জমি থেকে আপনাকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালায় তাহলে আপনি এই ধারায় আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। যদিও এই ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য।

জমি অবৈধ দখল করলে যেভাবে দখল পুনরুদ্ধার করবেন

ভূমিদস্যু শব্দটার সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। গ্রাম ও শহরে পেশিশক্তি দেখিয়ে একজনের জমি অন্যজন দখল করে নেওয়ার প্রবণতা কম নয়। ভূমিদস্যুতা ঠেকানোর জন্য ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর ৮ ধারা বিধান করা হয়েছে।

৮ ধারার বলা হয়েছে কোন ব্যক্তিকে বে-আইনিভাবে তার দখলীয় ভূমি থেকে বেদখল করলে তিনি এই ধারাবলে উক্ত জমি উদ্ধার করতে পারবেন। এইক্ষেত্রে দখল উদ্ধারের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন করতে হবে। স্থানীয় এসিল্যান্ড বরাবর আবেদন করলে তিনি উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনে এবং তদন্ত করে জমির দখল উদ্ধার করতে পারেন।

এই ধারার অনুবলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৩ মাসের মধ্যে জমির দখল উদ্ধারের আবেদন নিষ্পত্তি করবেন। যদি আপনার আবেদন পাওয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সেক্ষেত্রে উক্ত কর্তৃপক্ষ বা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করা যাবে।

তবে এই ধারার ব্যতিক্রম হচ্ছে যদি একই বিরোধীয় জমি নিয়ে দেওয়ানী আদালতে দখল উদ্ধারের মামলা চলমান থাকে তাহলে এই ধারায় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

জমি ক্রয়ের পর দখল না দিলে করণীয়

অনেক সময় দেখা যায়, জমি বিক্রির যাবতীয় কাজ সম্পাদন হওয়ার পরেও ভূমি বিক্রেতা প্রতারণার মাধ্যমে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে চান না। আজকাল করে বছরের পর বছর ধরে জমির দখল দেন না।

এক্ষেত্রে নতুন ভূমি আইনের ৯ ধারায় বিধান করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি তার জমি বিক্রয়ের পরেও যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিত সে জমির দখল ক্রেতা বরাবর বুঝিয়ে না দেন তা হবে অপরাধ। এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি ২(দুই) বছর পর্যন্ত কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন।

কারো কাছ থেকে কোন জমি ক্রয়ের পর আপনার দখল বুঝিয়ে না দিলে আপনি এই ধারামতে মামলা দায়ের করতে পারেন। মামলা দায়েরের পর যদি আপনার দখল বুঝিয়ে দেয় তাহলে চাইলে আপোষ করাও যেতে পারে।

জমির সীমানা বা জমির সম্পদের ক্ষতি করলে করণীয়

পাশাপাশি ভূমি মালিকদের মধ্যে সীমানা বিরোধ হরহামেশায় হয়ে থাকে। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে দেখা যায় সীমানায় অবস্থিত ঘেরা-বেড়া কিংবা সীমানা পিলার ভেঙে দেন পাশের জমির মালিক। তাছাড়া জমিতে অবস্থিত নানান স্থাপনা, গাছ, ফসলের ক্ষতি করেন।

এক্ষেত্রে ভূমি আইনে ১০ ধারায় বিধান করা হয়েছে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির আইনানুগভাবে দখলকৃত ভূমির সীমানা বা সীমানা চিহ্নের ক্ষতিসাধন করেন অথবা এইরূপ কোনো কাজ করেন যাতে উক্ত ভূমি অথবা তাতে অবস্থিত স্থাপনা, বৃক্ষ, ফসলের কোনো ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে তা হবে অপরাধ, এবং সেজ্জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

সুতরাং আপনার ভূমির সীমানা ও অবস্থিত স্থাপনা কিংবা ফসলের সুরক্ষা এই আইনের মাধ্যমে করা হয়েছে।

ভূমি সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা করলে সমান শাস্তি

আপনার জমি অবৈধভাবে দখলে রাখা কিংবা বে-আইনিভাবে বে-দখল করার মতো অপরাধগুলো কখনোই এককভাবে সংগঠিত হয় না। দেখা যায় সংঘবদ্ধভাবে এসব অপরাধ করা হয়ে থাকে।

এই আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনে বর্ণিত কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্ররোচনা দেন তাহলে তাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, এবং সেজ্জন্য সহায়তা বা প্ররোচনাকারীও প্রকৃত অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তির সমপরিমাণ দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

সুতরাং, ভূমিদস্যুতা মোকাবেলায় সমন্বিত অপরাধ করলেও সকলের সমান অপরাধ বলা হয়েছে এই আইনে।

প্রতিকারের পাশাপাশি চাইতে পারেন ক্ষতিপূরণও

আপনার বৈধ মালিকানার জমি বা ভূমি উদ্ধারে যদি আপনাকে থানা-আদালত করতে হয় এবং আপনার বৈধ জমির দখলের কারণে আপনার আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেক্ষেত্রে এই আইনের অধীন আপনি মামলা দায়েরের পর প্রতিকার পাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণও দাবী করতে পারেন।

এই আইনের ২০(১) ধারানুযায়ী আদালত উপযুক্ত ব্যক্তির নিকট দখল অর্পণের জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করতে পারে এবং আপনি যদি আসলেই বৈধ মালিক হয়ে থাকেন তাহলে আপনি জমির দখল বুঝে পাবেন।

অন্যদিকে ২০(২) ধারায় বলা হচ্ছে, এই আইনে বর্ণিত অপরাধের বিচারকারী ফৌজদারি আদালতের নিকট যদি প্রতীয়মান হয় যে, সংঘটিত অপরাধের ফলশ্রুতিতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে উক্ত আদালত অপরাধীর কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সংস্থাকে প্রদানের আদেশ দিতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

ভূমি সংক্রান্ত এসব অপরাধের বিচার যেখানে পাবেন

সাধারণ মানুষের বিচার প্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল হলো আদালত। উপরের বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় দেখা যায়, দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটর কাছে করতে পারেন। তাছাড়া আপনার নিকটস্থ থানায়ও আপনি এই আইনের অধীন মামলা দায়ের করতে পারেন।

তাছাড়া এই অপরাধসহ এই আইনে উল্লেখিত সকল অপরাধের মামলা আপনি আপনার এখতিয়াধীন ১ম শ্রেণীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটর আদালতে দায়ের করবেন। এবং উক্ত ম্যাজিস্ট্রেট এসব অপরাধের বিচার করবেন।

এই আইনের অধীন মামলা প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করতে হবে। তবে আমাদের দেশের পারিপার্শিক অবস্থায় বলা যায় সাধারণত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কোন মামলায় ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয় না। সেক্ষেত্রে ১৮০ দিনের বেশি সময় অতিবাহিতও হতে পারে।

আমাদের পরামর্শ

দেশের নিম্ন আদালতসমূহের ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলাসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অধিকাংশ মামলা হচ্ছে ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে। দৈনন্দিন মারামারি-হানাহানিসহ নানান রকমের অপরাধে মানুষ জড়িত হচ্ছে ভূমিকে কেন্দ্র করে।

এসব নানান অপরাধ নিরোধের জন্য এবং দ্রুত ভূমির মালিকানা ও দখল ফিরে পাওয়ার জন্য ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ যে যুগপোযোগী একটি আইন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রতিনিয়ত এই আইনে যেমন মামলা দায়ের হচ্ছে তেমনি মানুষ এইসব মামলা থেকে দ্রুত সুফল পাচ্ছে।

উপরের সহজ-সরল আলোচনা থেকে নিশ্চয় আপনার ভূমিতে নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন। এবার আপনার নিজেরও যদি এমন কোন সমস্যা থেকে থাকে অবশ্যই দক্ষ ও বিজ্ঞ একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতের দারস্থ হন, আশা করি সফলতা পাবেন। ধন্যবাদ।

অ্যাড. শিপ্ত বড়ুয়া
অ্যাড. শিপ্ত বড়ুয়া
বর্তমানে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন, পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য লিগ্যাল হোমে আইনি পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন। তাছাড়া জ্ঞানান্বেষণ সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। তিনি আইন ও বিচার বিষয়ে এলএলবি (অনার্স) এবং এলএলএম সম্পন্ন করেছেন। সামুদ্রিক আইন, পরিবেশ আইন এবং অপরাধ বিজ্ঞানে বিশেষ আগ্রহ তার।

মন্তব্য করুন

আপনার মন্তব্য
আপনার নাম

আরও লেখা